মঙ্গলবার, ৩০ Jun ২০২৬, ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন
টানা ঝড়ো হাওয়া, অবিরাম ভারী বর্ষণ আর জলোচ্ছ্বাসে উপকূল ভাসিয়ে বাংলাদেশের স্থলভাগ অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। গত সোমবার রাতে উপকূলে আঘাত হানার পর ক্রমেই শক্তি হারিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সেটি প্রথমে নিম্নচাপ ও পরে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। কার্তিক মাসের এ ঘূর্ণিঝড়টি যতটা তাণ্ডব চালাবে বলে মনে করা হচ্ছিল শেষ পর্যন্ত ততটা হয়নি। তারপরও দেশের অন্তত ১৫ জেলায় সিত্রাংয়ের কারণে ৩৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। অনেক জেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বা উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়া জলোচ্ছ্বাসের পানি নামেনি গতকাল বিকেলেও। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দিয়েও জোয়ারের সময় পানি ঢুকেছে অনেক এলাকায়। প্লাবনে ভেসে গেছে গবাদিপশু, মাছের ঘের, ধান আর সবজিক্ষেত। ঝড়ের বেগ কম হলেও টানা বর্ষণের কারণে উপড়ে গেছে হাজারো গাছপালা। বিচ্ছিন্ন হয়েছে লাখো গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ। বিঘি্নত হচ্ছে মোবাইল-ইন্টারনেট সেবা। বিভিন্ন এলাকায় সড়কে গাছ পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় দেখা গিয়েছে মানুষ ও গো-খাদ্যের সংকট। তবে সব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ঘরবাড়িতে না ফেরায় ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব এখনো মেলেনি।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের তথ্যমতে, সিত্রাংয়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। সেখানকার সন্দ্বীপ চ্যানেলে তীব্র বাতাস ও ঢেউয়ে বালু তোলার ড্রেজার ডুবে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ভোলায় গাছচাপা পড়ে ও পানিতে ডুবে পাঁচজনের প্রাণহানি হয়েছে। কুমিল্লায় গাছচাপা পড়ে বাবা, মা ও সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। টাঙ্গাইলে ঝড়ের কবলে পড়ে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য ও এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে সিত্রাংয়ের প্রভাবে গাছ ভেঙে পড়ে, দেয়াল ধসে এবং পানিতে ডুবে দুজন করে মারা গেছে। এসব কারণে শরীয়তপুর, গাজীপুর, নোয়াখালী, বরগুনা ও নড়াইল থেকেও একজন করে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এবার ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং জন্ম নেওয়ার আগেই দেশি-বিদেশি নানা সূত্র থেকে বলা হচ্ছিল এটি সুপার সাইক্লোন, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীও বলেছিলেন, এটি হবে প্রবল ঘূর্ণিঝড়। তবে শেষ পর্যন্ত সিত্রাং বড় আকারের ঘূর্ণিঝড় হয়নি। এর সর্বোচ্চ গতিবেগও ছিল ৮০ কিলোমিটারের কম। বাংলাদেশের উপকূলে সিত্রাং আঘাত করার সময় নিয়ে আগের করা পূর্বাভাসগুলোও পুরোপুরি মেলেনি। সোমবার মাঝরাতেই শক্তি হারিয়ে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয় সেটি। আর গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে লঘুচাপে রূপ নিয়ে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম সেটি। গতকাল রাতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, লঘুচাপটি আরও দুর্বল হয়ে ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থা করছিল। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সিত্রাং সাগরে শক্তি সঞ্চয় করছিল, সেটি অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হিসেবেই উপকূলে আঘাত হানতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে অতিভারী বর্ষণের কারণে সেটি শক্তি হারাতে শুরু করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিম্নচাপ ও পরে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। ফলে কার্তিক মাসের এ ঘূর্ণিঝড়টি যতটা তাণ্ডব চালাবে বলে মনে করা হচ্ছিল ততটা হয়নি। তার ওপর উপকূলসহ মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলায় সিত্রাং যে ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে তা সারিয়ে তুলতে অর্থ, সময় দুটোই লাগবে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের মিরসরাই উপকূলের সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালু তোলার ড্রেজার ডুবে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গত সোমবার রাতে উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের ৩ নম্বর জেটি এলাকার পশ্চিমে এ ড্রেজারডুবির ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া শ্রমিকরা হলেন ইমাম মোল্লা, মাহমুদ মোল্লা, শাহীন মোল্লা, আল-আমিন, মো. তারেক ও বাশার। অন্য দুজনের নাম জানা যায়নি। ওই শ্রমিকদের সবার বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠী এলাকায়। তবে ড্রেজারটি থেকে তীরে আসতে সক্ষম হয়েছেন মো. সালাম নামে এক শ্রমিক। মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিনহাজুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই অন্য শ্রমিকরা নৌকা নিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তখন তারা ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের মৃত অবস্থায় দেখেন। লাশ উদ্ধারে সাগরে ডুবুরি ও ফায়ার সার্ভিস দল কাজ শুরু করেছে।